করোনাভাইরাসঃ রাজশাহী অঞ্চলে বোরো ধান কাটায় শ্রমিক সংকটের আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজশাহী অঞ্চলে বোরো ধান কাটা শুরু হয়ে গেছে। তবে জমি থেকে ধান কাটা-মাড়াই করে ঘরে তোলার ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের কারণে এবার তিব্র শ্রমিক সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কিন্তু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, সবার সহযোগিতায় ধান জমি থেকে ঘরে আনাতে তেমন সমস্যায় পড়তে হবে না কৃষকদের। আগামী মে মাসের ২৫-২৫ তারিখের মধ্যে জমি থেকে ধান উঠে যাবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার চার জেলায় ব্যাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয় থেকে জানা যায়, এবার চার জেলায় (রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর) বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে। কিন্তু কৃষি বিভাগের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি বোরো আবাদ হয়েছে; ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৩৫ হেক্টর জমিতে। আর এই হিসাব অনুযায়ী ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ২১৬ মে.টন চাল উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অতিরিক্ত পরিচালক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এবার রাজশাহী অঞ্চলে নওগাঁ জেলায় বেশি বোরো আবাদ হয়েছে। এই জেলায় ১ লাখ ৮২ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে, রাজশাহী জেলায় ৬৬ হাজার ২৬৫ হেক্টর, নাটোর জেলায় ৫৭ হাজার ৭০ হেক্টর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৪৭ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।

জানা গেছে, ১ বিঘা জমিতে ধান কাটা থেকে শুরু করে মাড়াই করে ঘরে তোলার জন্য ৫ থেকে ৬ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। আর কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটতে ১ বিঘা জমিতে ১ ঘণ্টা সময় লাগে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয় থেকে এবার প্রথম ধাপে চার জেলায় বোরো ধান কাটার জন্য ৭০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১০টি রিপার মেশিন (ধান কাটার যন্ত্র) বিতরণ করা হয়েছে। এর আগের মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে ৮৭টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১৫৮টি রিপার মেশিন বিতরণ করা হয়েছে।

রাজশাহীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ সুধেন্দ্রনাথ রায় বলেন, এই দুর্যোগ মুহূর্তে আমাদের কৃষিপণ্য উৎপাদন ঠিক রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী একখণ্ড জমিও ফেলে রাখা যাবে না। যাতে করে করোনাভাইরাসের কারণে আমাদের দেশ খাদ্য সংকটে না পড়ে। এজন্য আমাদের কৃষক থেকে শুরু করে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

নাটোরের সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া গ্রামের কৃষক মোল্লা বলেন, ধানকাটা মৌসুমে আমাদের এলাকায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক এসে ধান কেটে ঘরে তুলে দিয়ে যায়। কিন্তু এবার কী হবে? এরমধ্যে অনেক জেলা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এই অবস্থায় অন্য জেলা থেকে কীভাবে শ্রমিকরা আসবে। যদি শ্রমিকরা লকডাউনের মধ্যে সময় মতো আসতে না পারে তাহলে কীভাবে ধান ঘরে উঠবে? বেশ দুশ্চিন্তায় আছি।

আয়েশ গ্রামের কৃষক শেখ বাহাউদ্দিন বলেন, আমার ২৯ বিঘা জমিতে মিনিকেট ধানপ্রায় পেকে গেছে। গত বছরের চেয়ে এবছর ফলন ভাল হবে আশা করছি। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আগামী সপ্তাহে আসতে চেয়েছে। শ্রমিকরা না আসলে বিপদের সীমা থাকবে না।

বিগত বছরগুলোতে ধান কাটা-মাড়াইয়ের সময়, নীলফামারী, ডোমার, কুষ্টিয়া, ভেড়ামারা, চুয়াডাঙ্গা, পোড়াদহ, আব্দুলপুর, আক্কেলপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান কাটা শ্রমিকরা আত্রাইসহ জেলার ১১টি উপজেলায় আসতো। কিন্তু এ বছর করোনা ভাইরাসের কারণে বাইরের শ্রমিকরা আসতে না পারলে ধান কাটা-মাড়াই নিয়ে শ্রমিক সংকট হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।

বাইরের শ্রমিকরা আসে তারপরও যে সব স্থানীয় শ্রমিক পাওয়া যায় তাদের দ্বিগুন পারিশ্রমিক দিতে হয়। এবার যদি বাইরের শ্রমিকেরা আসতে না পারে তা’হলে বড়ই বিপাকে পড়বে কৃষকে।

এ ব্যাপারে কৃষিবিদ সুধেন্দ্র নাথ রায় বলেন, নাটোর ও নওগাঁ জেলায় অধীনে চলনবিলে ধান কাটা শুরু হয়ে গেছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ধান কাটা এখনও শুরু হয়নি। কয়েকদিন পর এই জেলায় ধান কাটা শুরু হবে। তাই এক এলাকায় ধান কেটে শ্রমিকরা অন্য এলাকায় ধান কাটতে চলে যান। এছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এতে করে নির্মাণ শ্রমিক, ইটভাটার শ্রমিক, ছোট-খাটো দোকানদার, রিকশা-ভ্যান চালকসহ অনেকে অলস সময় অতিবাহিত করছে। তাই তাদেরকে ধান কাটার জন্য কাজে লাগাতে হবে। তারা এই সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধান কাটতে গেলে তেমন শ্রমিক সংকট হবে না। সেই সাথে আমাদের দেয়া ধান কাটার মেশিনগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। তাই আবহাওয়া ভালো থাকলে ধান কাটতে শ্রমিক সংকট হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ধান কাটার সময় জমিতে অনেক শ্রমিক এক জায়গায় কাজ করবেন। তাই তাদের করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এব্যাপারে কৃষি বিভাগ থেকে শ্রমিক ও কৃষকদের কোনো ধরনের পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে কি না-এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষিবিদ সুধেন্দ্র নাথ রায় বলেন, আগে জীবন, পরে কাজ। তাই করোনাভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাধ্যমে কৃষক ও শ্রমিকদের পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। সেই সাথে তাদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে কোনো সমস্যা হলে আমাদের কর্মকর্তারা প্রশাসনের মাধ্যমে তাদেরকে সহযোগিতা করছে। এমনকি কৃষি অফিস থেকে লিখিত অনুমতি শ্রমিকদের কাছে তুলে দেয়ার পাশাপাশি নিজের সুরক্ষার বিষয়টিও অবগত করানো হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয় থেকে জানা যায়, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় মোট কৃষি জমির পরিমাণ ৭ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৮ হেক্টর। তিন ফসলি হিসেবে তা দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ৪২৮ হেক্টর। মোট কৃষক পরিবার আছেন ১৫ লাখ ২১ হাজার ৭৮৭ টি। গড়ে প্রতিবারে ৫ জন করে সদস্য ধরলে কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত লোকজন হচ্ছে প্রায় ৭৭ লাখ। রাজশাহী অঞ্চলের এক কোটি জনসংখ্যার মধ্যে এই ৭৭ লাখ মানুষকে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে মাঠে যেতে হয় কৃষি কাজ করতে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ শামসুল হক জানান, কৃষকদের সবাইকেই প্রতিদিন মাঠে যেতে হচ্ছে ফসল পরিচর্যার জন্য। যতই দুর্যোগ থাকুক তাদের ফসলের পরিচর্যার জন্য যেতেই হবে। তাই তাদের আমরা বলেছি যতটুকু পারা যায়, মাঠে সামাজিক দূরত্ব মেনে যেন তারা কাজ করেন। এছাড়া বাসায় ফিরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও মাস্ক পরে মাঠে কাজ করারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

একই ধরনের খবর

মন্তব্য করুন