ঘটনাস্থল ডেমড়া; লক্ষ্য বাঙ্গালী হিন্দু গণহত্যা ও ধর্ষণ

৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধে ধর্ষিত ও নির্যাতিত নারীদের জন্য বীরাঙ্গনা খেতাবটি দিয়েছিলেন জাতির মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা জানি রনাঙ্গনের বীর নারীরাই হলো বীরাঙ্গনা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের প্রায় ২ লক্ষ নিরীহ নারী পাকি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। এদের অনেক বীরাঙ্গনাকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল জামুকা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে।

কিশোরগঞ্জের মীরা রানী চৌহান, গাইবান্ধার শ্রীমতি কুলোবালা রানী দাস, কুষ্টিয়ার ময়না খাতুন, মাবিয়া খাতুন, মোছাঃ টগরজান ও জরিনা খাতুন। গাজীপুরের সুরবালা, টাঙ্গাইলের জহুরা খাতুন, ঝিনাইদহের রিজিয়া খাতুন, জয়পুরহাটের আমেনা বেগম, গোপালগঞ্জের হেনা, সুনামগঞ্জের বসন্তী ধর, টাঙ্গাইলের শেফালী, সাতক্ষীরার রাজিদা বেগম, ময়মনসিংহের শাহানাজ পারভীন, রানী বালা দাস ও শিরিন মমতাজদের মতো দেশে অনেকেই এই স্বীকৃতি পেয়েছে। অস্বীকার করা যাবে না এদের অনেকেই পেয়েছে সরকারি নানা সুযোগ সুবিধা। অথচ উত্তর জনপদের সবচেয়ে বড় এবং নির্মম গণহত্যা সংগঠিত হয়েছিল পাবনার ডেমড়া গণহত্যা।

পাকি সেনাদের হাতে নির্মম হত্যা-নির্যাতনের শিকার ডেমরা গ্রামের শহীদ নিরেনচন্দ্র দাসের স্ত্রী শেফালি দাস (৭২), শহীদ জগদীশ চন্দ্র কুন্ডুর স্ত্রী নিভা বালা কুন্ডু (৮০), ডেমরা পালপাড়ার শহীদ দূর্গাচরণ পালের স্ত্রী শান্তি বালা পাল (৮১), ডেমরা চরপাড়া গ্রামের শহীদ খবির প্রামানিকের স্ত্রী শরিফুন্নেছা সৈরভ (৭৩), শহীদ কুরমন ফকিরের স্ত্রী সহিতন নেছা (৭০), শহীদ হোসেন মোল্লার স্ত্রী হালিমা খাতুন (৭৩), শহীদ আলম প্রামানিকের স্ত্রী শুকুরন খাতুনের (৭৩) মতো শত শত শুকুরন সব হারানোর ব্যথায় কাতর হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই জনপদে।

এদের অনেকেই শোকে তাপে চলে গেছে না ফেরার দেশে। এদের কারো ভাগ্যেই মেলেনি নারী মুক্তিযোদ্ধা কিম্বা বীরাঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃিত। পায়নি কোন সরকারি সুযোগ সুবিধা।

ফরিদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুল হালিম জানান, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর এদের এককালীন ৫০০ টাকা করে অনুদান দেয়া হয়েছিল। গণহত্যার শীকার শহীদ পরিবারের এমন অবহেলা জাতি হিসেবে মানবিক মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এটাই স্বাভাবিক। এই গণহত্যায় ধর্ষিতা, নির্যাতিত শত শত নারী কেন বীরাঙ্গনা কিম্বা নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবে না এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মুখে মুখে দীর্ঘদিন ধরে। নির্মম এতোটাই নির্মম ছিল সেদিনের ডেমড়া গণহত্যার লোমহর্ষক কাহিনী এখনও সে কথা মনে করে চোখের পানিতে ভেসে বেড়ায় পাবনা জনপদের হাজার হাজার মানুষ।

১৩ মে ১৯৭১ ভোর সাড়ে ৫ টা। এদিন ছিল শুক্রবার। একসাথে গর্জে উঠেছিল মেশিনগানের শত শত বুলেট। এই হত্যার লক্ষ্য বাঙ্গালী হিন্দু গণহত্যা, হত্যাকান্ডে ব্যবহার করা হয়েছিল রাইফেল ব্যেয়ানেট অস্ত্র হালকা মেশিনগান। শহীদ হয়েছিল ৯০০ এর অধিক মানুষ। শহীদদের সংখ্যাগরিষ্ট ছিল হিন্দু। পাকি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার ডেমরা গণহত্যা চালিয়েছিল।

বাঘাবাড়ি দক্ষিণপাড় থেকে টিয়ারবন্দ চড়াচিথুলিয় সিলন্দা নাগডেমরা হয়ে প্রায় ৯ কিলোমিটার পথ পায়ে হেটে দখলদার পাকি সেনাবাহিনী পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা ইউনিয়নের ডেমরা গ্রামে পৌছে। মুসলিমরা ফজরের নামাজের জন্য মসজিদে যাচ্ছে হিন্দু জনগোষ্টী তখনো ঘুমিয়ে। এমন সময় গ্রামের নিরস্ত্র হিন্দু বাসিন্দাদের উপর নির্মম এই গণহত্যা চালিয়েছিল।

অনুমান করা হয় এই একদিনেই ৮০০ থেকে ৯০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। ধর্ষণ ও লুণ্ঠন করা হয়েছিল এবং মসজিদ, মন্দির, স্কুল ও ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসাবে পাকি দখলদার সেনা যখন ঢাকার বাইরের জেলাগুলির দিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন লোকেরা তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে শুরু করে। হিন্দুরা বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করেছিল প্রতিবেশী দেশ ভারতে।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, পাবনার বেড়া ও আতাইকুলাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধনাঢ্য হিন্দু পরিবার তাদের সোনাদানা নগদ টাকাসহ বহনযোগ্য ধন সম্পদ নিয়ে প্রত্যন্ত দূর্গম রূপসী, বাউশগাড়ী ও ডেমড়া গ্রামে নিরাপদ ভেবে আশ্রয় নিয়েছিল। স্থানীয় সহযোগী রাজাকার আসাদের নেতৃত্বে পাকি দখলদার সেনাবাহিনী বড়াল নদী পাড় দিয়ে হেটে ওই অঞ্চলে প্রবেশ করে এবং পরে মতিউর রহমান নিজামীর নিজ উপজেলা সাথিয়ার ধুলাউড়ি ইউনিয়নের বাঁউশগাড়ি ও রূপসী গ্রাম ঘেরাও করে। আসাদ ও তার সহযোগী একদল রাজাকার পাকি সেনাদের বাউশগাড়ি রূপসী ও ডেমরা গ্রামে নিয়ে গিয়েছিলেন। ভোর রাতেই পুরুষদের তাদের বাড়ি থেকে টেনে হেঁছড়ে নিয়ে এসে একটি লাইনে দাঁড় করানো হয়, এবং সহযোগী রাজাকারদের সহায়তায় পাকি সেনারা তাদের সামনে মহিলাদের ধর্ষণ করেছিল। এরপরেই নারী-পুরুষ উভয়কে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল এবং তাদের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছিল।

এ গ্রামের কয়েকজন বেঁচে যাওয়া লোক পরদিন সকালে একটি গণকবরে মৃতদেহ ফেলে মাটি চাপা দিয়ে রেখে যায়। বাউশগাড়ি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৩শ’জন হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১১ সদস্যের একটি দল ২০১০ সালে ডেমরা গণহত্যার তদন্ত করেছিল। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর সায়েদ রেজাউর রহমান। তদন্তকারীরা বাউশগাড়ি গ্রামে হত্যার স্থানগুলি পরিদর্শন করেছিলেন এবং যুদ্ধাপরাধের সাক্ষীদের কথা বলেছিলেন। এসময় তদন্তে তারা মতিউর রহমান নিজামীকে গণহত্যার মাস্টার মাইন্ডিংয়ের জন্য দোষী দাবী করেন। আমরা জানি যে এঘটনায় ২০১৬ সালে মতিয়ার রহমান নিজামিকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিল।

আমরা সবাই এ কথা অবশ্যই জানি ৭১’র ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বলা চলে সেদিন থেকেই একটি জনযুদ্ধের আদলে গেরিলাযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে। ২৫ মার্চের এই কালো রাতে পাকি বাহিনী ঢাকায় অজস্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ ও ইপিআর সদস্যদেরকে হত্যা করে। এদিন আওয়ামীলীগ প্রধান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছিল।

জামাত-ই-ইসলামীর সদস্য, নেতা-কর্মী পাকি বাহিনীর সাথে ধর্ষণে লিপ্ত হয় এবং হত্যাকান্ডে মেতে উঠে। রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের পরিচয়ে তাদের নির্মমতা বৈশ্বিকভাবে প্রকাশ পেতে থাকে ও গণমাধ্যমগুলো বেশ কয়েকটি গণহত্যা ও গণধর্ষণের ঘটনা বিশ্বব্যাপী প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত করে। দেশে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড যুদ্ধকালীন পাকি বাহিনী ও স্থানীয় দোসর জামাত-ই-ইসলামী শীর্ষস্থানীয় বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবীদেরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। অধ্যাপক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিল্পী, প্রকৌশলী ও লেখককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে পাকি বাহিনী ও রাজাকারেরা ঢাকায় নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগ ও নগরীর অন্যান্য নির্যাতন কেন্দ্রে হত্যা করা হয়েছিলো দেশের বুদ্ধিজীবীদের।

দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাকি ও তার স্থানীয় সহযোগীরা সুপরিকল্পিতভাবে দেশের ৯৯১জন শিক্ষক, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবী ও ১৬ জন লেখক-প্রকৌশলীকে হত্যা করেছিল।

উল্লেখ করা প্রয়োজন ৭২’র ৩০ জানুয়ারি তারিখে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানকে হত্যা করা হয়েছিল। ঐদিন তিনি মিরপুরে অস্ত্রধারী বিহারীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন।

২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যস্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল। যেসব বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে রয়েছে অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. মুনীর চৌধুরী, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. আনোয়ার পাশা, ড. এম আবুল খায়ের, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, হুমায়ুন কবির, রাশীদুল হাসান, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, সিরাজুল হক খান, ফাইজুল মাহি, ড. সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য ও সাইদুল হাসান; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হবিবুর রহমান, অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমদ্দার, অধ্যাপক মীর আব্দুল কাইয়ুম, মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী, ড. এএফএম আলিম চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, নিজাম উদ্দিন আহমেদ, সেলিনা পারভীন, আলতাফ মাহমুদ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, সাইদুল হাসান, জহির রায়হান ও রণদাপ্রসাদ সাহা। যুদ্ধকালীন সময়ে অগণিত মহিলাকে নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে।

প্রায় ২ লক্ষ নারী ধর্ষণ নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তারা হাজার হাজার যুদ্ধ-শিশুর জন্ম দিয়েছেন। এছাড়াও দানব পাকি বাহিনী অগণিত বাঙ্গালী মহিলাকে ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে যৌন-দাসীরূপে আটকে রেখেছিল। যুদ্ধ পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবুর রহমান যুদ্ধকালীন ধর্ষিতা ও নির্যাতিত নারীদেরকে বীরাঙ্গনা নামকরণে সন্মানিত করেছিল।

এ কথা সত্য যে পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক সহিংসতা ও নির্যতনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুদেরকে বিতাড়িত করা ও ভারতীয় প্রভাব থেকে এ দেশকে মুক্ত রাখা। এ জন্যই যে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাঙালী সংস্কৃতিকে হিন্দু ও ভারতীয় সংস্কৃতির দ্বারা প্রভবিত বলে মনে করতো। এ কারনেই পাকি বাহিনী বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিলেন।

আমরা সবাই এ কথা জানি যে ৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় ও পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে সন্ত্রাসের শিকার অনেক বিহারী মুসলিম ভারত থেকে প্রাণরক্ষার্থে অভিবাসিত হয়ে সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। এই সব বিহারী মুসলিমরা ৭১’র যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে পাকি সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নেয়। তাদের কেউ কেউ রাজাকার ও আলবদর আল শামসের ন্যায় আধা সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়। তারা বাঙালীদেরকে হত্যাসহ বাঙালীদের সম্পদ লুটতরাজসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়।

এই গণহত্যা নিয়ে মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি পাকিস্তান সরকারকে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছিল এবং মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য পুরোপুরি স্থগিত রাখার বিষয়ে হুশিয়ারী বার্তা প্রদান করেছিলেন। এই হত্যাকান্ডের খবর যাতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে না পৌঁছায় সে লক্ষ্যে ২৫ মার্চের আগেই বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। এতোকিছুর পরও সাংবাদিক সাইমন ড্রিং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করে। তিনি ওয়াশিংটন পোস্টের মাধ্যমে সারা পৃথিবীকে এই গণহত্যার খবর জানিয়েছিলেন।

শুরুতে এই হত্যাযজ্ঞের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা। পরবর্তীতে বাঙালি গণহত্যা বিশেষ করে হিন্দু জনগোষ্টী হত্যা পুরো দেশজুড়ে চালানো হয়েছিল। একমাত্র হিন্দু আবাসিক জগন্নাথ হল পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিল ঘাতক পাকি বাহিনী। এ হলের ৬০০ থেকে ৭০০ আবাসিক ছাত্রকে বুলেট আর ব্যেয়ানেট চার্জে ক্ষত বিক্ষত করে গণহত্যা করা হয়েছিল।

৭১’র সালের দেশে স্বাধীনতার যুদ্ধকালীন সময়ে গণহত্যা চলাকালে অনেক বাঙালি নারী সম্ভ্রম হারায়। যার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। বাংলাদেশে ধারণা করা হয় প্রায় ২ লক্ষ নারী মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষিত হয় এবং তাদের গর্ভে অনেক যুদ্ধশিশু জন্ম নেয়। ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে পাকিস্তানি সৈন্যরা অনেক মেয়েকে ধরে নিয়ে সেখানে আটকে রেখেছিল।

১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক বিচারকমন্ডলী কমিশনের (আইসিজে) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, পুরো সামরিক কার্যক্রম ও দমন-নিপীড়নমূলক কার্যক্রমে পাকি সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় সহায়ক বাহিনী ধর্ষণ ও গণহত্যায় জড়িত ছিল। পাকি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী দোসরেরা বাঙালী জনগোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট তিনটি ভাগে ভাগ করে হত্যাকান্ডের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। এ তিনটি ভাগের একটি হলো আওয়ামীলীগের সদস্য দ্বিতীয়ভাগটি হলো ছাত্র এবং তৃতীয় ও সর্বশেষ ভাগটি হলো পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত হিন্দুধর্মীয় জনগোষ্ঠী।

প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, প্রধান পরিচিত ব্যক্তিদেরকে এর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করলেও যুদ্ধের শেষদিকে নির্বিচারে বাঙালীদেরকে গণহত্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

একইভাবে, ধারণা করা হয় যে, গণহত্যার ন্যায় অমানবিক অপরাধে পুর্ব পাকিস্তানের হিন্দু জনগোষ্ঠী এর শিকারে পরিণত হয়েছিলে। ডেমরা গণহত্যা এরই ধারাবাহিকতার একটি অংশ এতে কোন সন্দেহ নেই। রূপসী, বাউশগাড়ী ও ডেমরার জনপদে সাদা থানে আবৃত জীর্ণশীর্ণ দেহতে আজ যারা বয়সেরভারে নূহ্য তারা সে সময় কেউ ১৮ আবার কেউ ২২বছরে যুবতি ছিল। কেউ ছিল মেহেদি রাঙা নববধু।

তাদের জীবণ যৌবনের ক্ষতি পুশিয়ে দেবার ক্ষমতা আমাদের নেই। দেশের অপর নারী মুক্তিযোদ্ধা অথবা বীরাঙ্গনাদের মতো সন্মানে তাদেরকে সন্মানিত করতে রাষ্ট্রকে ডেমরা গণহত্যার দায় নিতে হবে। দেরীতে হলেও দায়মুক্তির জন্য শেষ বয়সে তাদের পাশে দাড়াতেই হবে। দেশের জন্য যাদের এতো অবদান সেই সব অসহায় ধর্ষিত স্বামীহারা নির্যাতিত জননী জন্মভূমিকে স্যেলুট করতে হবে আমাদের সবাইকে।


আতিক সিদ্দিকী
সাংবাদিক-কলাম লেখক

একই ধরনের খবর

মন্তব্য করুন