প্রমত্তা বড়াল নদী ৩০ বছর পর নব যৌবনে

বড়াল নদী প্রায় মরতেই বসেছিল। আশা ছিল না বাঁচার। একটানা ৩০ বছর মুখ বুজে সহ্য করেছে দখল আর দুষণ নামক নির্যাতন। এক শ্রেণীর সুবিধাবাদি চক্র নিয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে।

এই রুগ্নদশার প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে পড়েছিল পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার ১০ উপজেলার লাখ-লাখ মানুষের জীবনযাত্রার উপর।

প্রভাব পড়েছিল চলনবিল অঞ্চলের জলজ জীববৈচিত্রেত উপর। তাই এ মৃত্যুরপথ যাত্রীকে যমের হাত থেকে বাঁচাতে ফুঁসে উঠেন ভুক্তভোগীরা।

অবশেষে প্রায় ১যুগ ধরে সংগ্রাম-আন্দোলনের পর যৌবন ফিরে পেয়েছে এক সময়ে প্রমত্তা বড়াল নদী।

নবযৌবন পাওয়া বড়ালে এখন বইছে স্রোত। নতুন পানিতে ( বর্ষার) লাফালাফি আর ঝাঁপাঝাঁপিতে মেতে উঠেছে শিশু-কিশোর- যুবক। কাটছে সাঁতার। নদের কিছু পয়েন্টে মাছ শিকার করছেন জেলেরা।

বড়শি দিয়ে মাছ ধরছেন সৌখিন মাছ শিকারিরা। অথচ চলতি বর্ষায় এমন চিত্র দেখা যাবে, কিছুদিন আগেও এটা কল্পনার বাইরে ছিল বড়ালপাড়বাসীর।

৩০ বছর পর নদটিতে বর্ষার পানি দেখে যেন আনন্দের শেষ নেই তাদের। উৎফুল্লতা দেখা গেছে বড়াল পাড়ের হাজার হাজার মানুষের মাঝে।

তবে সেই আনন্দের মাঝেও দুঃখ রয়েছে নদীর বুকে অজগর সাপের মতো শুয়ে থাকা কুচরিপানা নিয়ে। কুচরিপানার কারণে দৃশ্যত কোন কাজে আসছে না নদীটি।

একাধিক সুত্র জানায়, ২২০কিলোমিটার নদীর প্রথম বন্দোবস্ত করা হয় ১৯৮১ সালে। সে সময় বড়াল নদীর উৎসমুখ রাজশাহীর চারঘাটে ও পাবনার ভাঙ্গুড়ার দহপাড়া পয়েন্ট জলকপাট নির্মাণ করা হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড এ জলকপাট নির্মাণ করে। এতেই বন্ধ হয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। পরবর্তীতে পাবনার চাটমোহরের চারটি পয়েন্ট দেওয়া হয় চারটি আঁড়াআঁড়ি বাঁধ।

ফলে প্রমত্তা বড়াল পুকুরে পরিণত হয়। ‘জলকর’ হিসেবে মাছচাষীদের কাছে লীজ দেয় সংশ্লিষ্ট দপ্তর। এতে বন্ধ হয়ে যায় উন্মুক্ত মাছ শিকার।

নদীর পেট থেকে হারিয়ে যায় হরেক রকমের ও নানান স্বাদের দেশীয় প্রজাতির মাছ। কীটনাশক, সার ও মাছের খাদ্য দিয়ে মাছের আবাদ চলায় বন্ধ হয়ে যায় নদীরপাড়ের মানুষের দৈনন্দিন কাজে পানি ব্যবহারের পথ।

সেচ কাজ এমনকি গোসল করতেও বাঁধা দেয় লীজ প্রহিতেরা। দীর্ঘ এ সময় বর্ষার পানি না ঢুকায় এ অঞ্চলে পানির স্তর ক্রমশ: নিচে নামতে থাকে।

ফলে পানির জন্য চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় শুষ্ক মৌসুমে। এ সময়টায় বড়াল নদীর বুকে আবাদ হয় ধানসহ সবজিত। এ অবস্থায় নদপাড়ের হাজার-হাজার মানুষ ফুঁসে উঠে।

২০০৮ সালে গড়ে উঠা বড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির ব্যানারে ভুক্তভোগীরা সংগঠিত হতে থাকে।

এগিয়ে আসে পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কমিটি (বাপা), পরিবেশ আইন সমিতি ( বেলা) ও এএলআরডিসহ বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠণ। সভা, সমাবেশ ও মানবন্ধনসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে শুরু হয় আন্দোলন।

আন্দোলনের মুখে বন্ধ হয়ে যায় লীজ দেওয়া। নদী সচল করার জন্য উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন আন্দোলনকারীরা। করা হয় রিট।

বিষয়টি আমলে নিয়ে বিজ্ঞ আদালত নদী সব জলকপাট ও বাঁধ অপসারণের জন্য নির্দেশ দেয় সরকারকে। ফলে বাঁধ অপসারণ করতো বাধ্য হয় সংশ্লিষ্টরা।

চারটি বাঁধের অনুস্থলে তিনটি পয়েন্টে করা হয় ব্রীজ। প্রাথমিকভাবে আন্দোলনের সফলতার স্বাদ পায় আন্দোলনকারীরা। কিন্তু নদের অভিভাবকদের অবহেলার কারণে নদটি পরিণত হয় কুচরিপানার ভাঁগাড়ে।

পরিণত হয় মশার প্রজনন ক্ষেত্রে। ফলে নতুনভাবে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের মাঝে। যদিও বর্ষার পানি আশা জাগাচ্ছে। কিন্তু নদী ভরা যৌবন উপভোগ করতে পারছে না একমাত্র কুচরিপানার কারণে।

চাটমোহর পৌরসভার মেয়র মির্জা রেজাউল করিম দুলাল বলেন, বড়ালের কুচরিপানা ও ময়লা-আবর্জনা ভেসে গেলে আমরা উপকার পাবো। কুচরিপানা অপসারণের চেষ্টা চলছে।

একই ধরনের খবর

মন্তব্য করুন