ঢাকা ১০:২৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞপ্তি :
সারাদেশের জেলা উপোজেলা পর্যায়ে দৈনিক স্বতঃকণ্ঠে সংবাদকর্মী নিয়োগ চলছে । আগ্রহী প্রার্থীগন জীবন বৃত্তান্ত ইমেইল করুন shatakantha.info@gmail.com

ফুলবাড়ীতে কৃষকের ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব

প্লাবন শুভ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:
  • প্রকাশিত সময় ০১:১৪:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ নভেম্বর ২০২২
  • / 30

ফুলবাড়ী, দিনাজপুর: ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতি। ছবি: স্বতঃকণ্ঠ


নতুন ধান ঘরে উঠানের কাজে ব্যস্ত দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষাণ-কৃষাণীরা। আর ধান ঘরে উঠলে ধুম পড়ে পিঠে-পায়েস খাওয়ার। সে উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার উপজেলার কৃষকের ঘরে ঘরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নবান্ন উৎসব। জাতি-ধর্ম-বর্ণ উপেক্ষা করে মেতে উঠেছিল সবাই নবান্ন উৎসবে। একে অন্যের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক সামাজিক মেলবন্ধনের।

সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি কৃষক প্রধান গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়, ধান কাটার মহোৎসব চলছে। কৃষক-কৃষাণী কেউ-ই বসে নেই। পিঠা-পায়েসসহ নবান্নের আয়োজনে কেউবা ধান কাটছেন, কেউবা করছেন মাড়াই। গৃহবধূরা ধানসিদ্ধ করে আতপচাল ঢেকি কিংবা জাঁতায় গুঁড়ি করছেন।

এদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে চলছে বিশেষ এক পূজো। বাড়ির আঙ্গিনায় পূজো শেষে সবাই একসাথে বসেছেন খেতে।

উপজেলার এলুয়াড়ী ইউনিয়নের পাকাপান গ্রামের শান্তনা রানী রায় ও আলাদীপুর ইউনিয়নের তালতলা গ্রামের মানষি রানী বর্মন বলেন, ‘নতুন ধানের পিঠা-পায়েস না খাইলে কী হয়? ছোট থেকেই নতুন ধানের চালের পিঠা খেয়ে আসছি। এই চালের গুঁড়া দিয়ে ভাপা, চিতই, সেমাই, তেলপিঠাসহ কত পিঠা হবে! পিঠা বানানোর দিন আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা বাড়িতে আসেন। সবাই একসঙ্গে বসে পিঠা বানাই। বিশেষ করে মেয়ে-জামাইরা আসে এইদিনে বাড়িতে। জমি থেকে ধান কেটে আনার পর বাড়িতে পূজো করা হয়। এটি আমার দীর্ঘবছরের প্রথা।’

শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে নবান্ন উৎসবে অংশ নেয়া কংকনা রায় ও কৃপিতা রায় বীথি বলে, ‘প্রতিবছর নবান্নে আমরা শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে যাই। এইদিনে আমাদের সব আত্মীয়-স্বজনরা গ্রামের বাড়িতে আসেন। সবাই মিলে নবান্ন উৎবের আয়োজনে খুব মজা হয়। নতুন ধানের পিঠা-পায়েসসহ ভালো খাবারের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া বিশেষ প্রার্থনা করা হবে, যাতে আগামী দিনেও মহাধুমধামের সঙ্গে নবান্ন উৎসব উদযাপন করতে পারি।’

কৃষক মদন কুমার রায়, হেমন্ত সাহা ও কার্তিক রায় বলেন, ‘যদিও আগাম জাতের ধান অনেক আগে কাটা হয়, তারপরও আমরা পূর্বপুরুষ থেকেই অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম সপ্তাহেই নবান্নের আয়োজন করে থাকি। এদিনে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।’

সামাজিক সংগঠন আমরা করব জয় সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি সাংবাদিক প্লাবন শুভ ও সম্পাদক সোহেল রানা বলেন, ‘বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য নবান্ন উৎসব। উৎসবটি যথাযথভাবে পালন করতে হবে তবেই মানুষের সঙ্গে মানুষে ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকবে। এসব লালন করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে আগামীতে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিভিন্নধরনের প্রতিযোগিতাসহ নবান্ন উৎসব ও পিঠা উৎসব পালনের উদ্যোগ নেয়া হবে।’

উপজেলা প্রবীণ শিক্ষক নাজিম উদ্দি মণ্ডল বলেন, ‘একসময় আড়ম্বরপূর্ণভাবে নবান্ন উৎসব উদ‌যাপিত হতো। সব ধর্মের মানুষের জন্য অসাম্প্রদায়িক সামাজিক উৎসব হিসেবে সারা দেশেই নবান্ন উৎসব সমাদৃত ছিল। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই মিলে এ উৎসব উদ‌যাপন করা হতো। তবে এখন মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন কমে গেছে। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে নবান্ন উৎসবের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে যদি তৃণমূল পর্যায়েও বড় পরিসরে উৎসব আয়োজন করা যেত, তাহলে এই ঐতিহ্য দীর্ঘদিন টিকে থাকত।’

ফুলবাড়ীতে কৃষকের ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব

প্রকাশিত সময় ০১:১৪:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ নভেম্বর ২০২২

নতুন ধান ঘরে উঠানের কাজে ব্যস্ত দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষাণ-কৃষাণীরা। আর ধান ঘরে উঠলে ধুম পড়ে পিঠে-পায়েস খাওয়ার। সে উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার উপজেলার কৃষকের ঘরে ঘরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নবান্ন উৎসব। জাতি-ধর্ম-বর্ণ উপেক্ষা করে মেতে উঠেছিল সবাই নবান্ন উৎসবে। একে অন্যের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক সামাজিক মেলবন্ধনের।

সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি কৃষক প্রধান গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়, ধান কাটার মহোৎসব চলছে। কৃষক-কৃষাণী কেউ-ই বসে নেই। পিঠা-পায়েসসহ নবান্নের আয়োজনে কেউবা ধান কাটছেন, কেউবা করছেন মাড়াই। গৃহবধূরা ধানসিদ্ধ করে আতপচাল ঢেকি কিংবা জাঁতায় গুঁড়ি করছেন।

এদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে চলছে বিশেষ এক পূজো। বাড়ির আঙ্গিনায় পূজো শেষে সবাই একসাথে বসেছেন খেতে।

উপজেলার এলুয়াড়ী ইউনিয়নের পাকাপান গ্রামের শান্তনা রানী রায় ও আলাদীপুর ইউনিয়নের তালতলা গ্রামের মানষি রানী বর্মন বলেন, ‘নতুন ধানের পিঠা-পায়েস না খাইলে কী হয়? ছোট থেকেই নতুন ধানের চালের পিঠা খেয়ে আসছি। এই চালের গুঁড়া দিয়ে ভাপা, চিতই, সেমাই, তেলপিঠাসহ কত পিঠা হবে! পিঠা বানানোর দিন আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা বাড়িতে আসেন। সবাই একসঙ্গে বসে পিঠা বানাই। বিশেষ করে মেয়ে-জামাইরা আসে এইদিনে বাড়িতে। জমি থেকে ধান কেটে আনার পর বাড়িতে পূজো করা হয়। এটি আমার দীর্ঘবছরের প্রথা।’

শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে নবান্ন উৎসবে অংশ নেয়া কংকনা রায় ও কৃপিতা রায় বীথি বলে, ‘প্রতিবছর নবান্নে আমরা শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে যাই। এইদিনে আমাদের সব আত্মীয়-স্বজনরা গ্রামের বাড়িতে আসেন। সবাই মিলে নবান্ন উৎবের আয়োজনে খুব মজা হয়। নতুন ধানের পিঠা-পায়েসসহ ভালো খাবারের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া বিশেষ প্রার্থনা করা হবে, যাতে আগামী দিনেও মহাধুমধামের সঙ্গে নবান্ন উৎসব উদযাপন করতে পারি।’

কৃষক মদন কুমার রায়, হেমন্ত সাহা ও কার্তিক রায় বলেন, ‘যদিও আগাম জাতের ধান অনেক আগে কাটা হয়, তারপরও আমরা পূর্বপুরুষ থেকেই অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম সপ্তাহেই নবান্নের আয়োজন করে থাকি। এদিনে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।’

সামাজিক সংগঠন আমরা করব জয় সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি সাংবাদিক প্লাবন শুভ ও সম্পাদক সোহেল রানা বলেন, ‘বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য নবান্ন উৎসব। উৎসবটি যথাযথভাবে পালন করতে হবে তবেই মানুষের সঙ্গে মানুষে ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকবে। এসব লালন করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে আগামীতে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিভিন্নধরনের প্রতিযোগিতাসহ নবান্ন উৎসব ও পিঠা উৎসব পালনের উদ্যোগ নেয়া হবে।’

উপজেলা প্রবীণ শিক্ষক নাজিম উদ্দি মণ্ডল বলেন, ‘একসময় আড়ম্বরপূর্ণভাবে নবান্ন উৎসব উদ‌যাপিত হতো। সব ধর্মের মানুষের জন্য অসাম্প্রদায়িক সামাজিক উৎসব হিসেবে সারা দেশেই নবান্ন উৎসব সমাদৃত ছিল। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই মিলে এ উৎসব উদ‌যাপন করা হতো। তবে এখন মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন কমে গেছে। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে নবান্ন উৎসবের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে যদি তৃণমূল পর্যায়েও বড় পরিসরে উৎসব আয়োজন করা যেত, তাহলে এই ঐতিহ্য দীর্ঘদিন টিকে থাকত।’