বিশ্বের ২৫টি পরিবেশবান্ধব শিল্পে বাংলাদেশ সপ্তম

ঢাকা প্রতিনিধিঃ পরিবেশবান্ধব পোশাক শিল্প কারখানা স্থাপনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্কীকৃতি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে সারা পৃথিবীতেই গুরুতর এক সমস্যা হিসাবে হাজির হয়েছে। যদিও এতে বাংলাদেশের অবদান খুবই নগন্য। তা সর্ত্বেও পরিবেশবান্ধব কারখানা নির্মাণের এই উদ্যোগ ভালো নজির হিসাবেই বিবেচিত হবে বহির্বিশ্বে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) লিড নামে পরিবেশবান্ধব স্থাপনার সনদ দিয়ে থাকেন। লিডের পূর্ণাঙ্গ রুপ হচ্ছে লিডারশিপ ইন এনার্জি এনভায়রনমেন্ট ডিজাইন। সারাবিশ্ব একযোগে সর্ব সম্মতিক্রমে রিক ফেডরিজ্জি, ডেভিড গোটফ্রাইড ও মাইক ইতালিয়ানো ১৯৯৩ সালে ইউএসজিবিসি প্রতিষ্ঠা করেন।

এখানে লীড বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত সবুজ বিল্ডিং-এর স্বীকৃতি প্রদান করে থাকেন। ইউএসজিবিসির নয়টি শর্ত পরিপালনে মোট ১১০ পয়েন্ট আছে। এর মধ্যে ৮০ পয়েন্টের বেশি হলে প্লাটিনাম, ৬০-৭০ পয়েন্টে গোল্ড, ৫০-৫৯ পয়েন্টে সিলভার এবং ৪০-৪৯ পয়েন্ট হলে লিড সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।

এ পর্যন্ত বালাদেশের ৩২টি কারখানা ও স্থাপনা পরিবেশবান্ধব সনদ অর্জন করেছে। পরিবেশবান্ধব কারখানার স্থাপনার দিকে এগোচ্ছে আরও অনেক শিল্প উদ্যোক্তা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এগিয়ে আছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ইউএসজিবিসির তালিকায় দেখা যায়, পরিবেশবান্ধব শিল্প কারখানা স্থাপনে বাংলাদেশ এক ধরনের নীরব বিল্পবই ঘটে গেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর অনুরোধে সম্প্রতি বিশ্বের পরিবেশবান্ধব শিল্প কারখানার একটি তালিকা পাঠিয়েছে ইউএসজিবিসি। সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে শীর্ষ ১০-এ স্থান পাওয়া বিশ্বের ২৫টি পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনার মধ্যে আছে বাংলাদেশের সাতটি। আর এসব প্রতিষ্ঠানের সব কটি তৈরি পোশাক কারখানা।

ইউএনএফসিসিসিন লিড সনদ পেতে নয়টি শর্ত পরিপালন করতে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এমন নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করতে হয় যাতে কার্বন নিঃসরণ কম হয়। এ জন্য পুনরায় উৎপাদনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া ইট, সিমেন্ট ও ইস্পাত লাগে। এছাড়া কারখানার ৫০০ বর্গমিটারের মধ্যে শ্রমিকদের বাসস্থান, স্কুল, হাট বাজার, বাস বা ট্যাম্পো স্ট্যান্ড থাকতে হবে।

কারণ দূরত্ব বেশি হলে শ্রমিকদের কারখানায় আসতে গাড়িতে উঠতে হয়। এতে করে জ্বালানি খরচের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ বেশি হয়। এর বাইরে বিদ্যুৎ খরচ কমাতে সূর্যের আলো, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়। ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি পানি সাশ্রয়ী কল ব্যবহার করতে হয়। এছাড়া, কারখানাসহ অন্য ভবন নির্মাণের নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখার বাধ্যবাধকতা আছে। কারখানার ভেতরের কর্ম পরিবেশ উন্নত এবং অবশ্যই শ্রমবান্ধব হতে হয়। উৎপাদনের জন্য সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হয়। ইউএসজিবিসির অধীনে কল-কারখানার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবন, স্কুল, হাসপাতাল, বাড়ি, বিক্রয় কেন্দ্র, প্রার্থনা কেন্দ্র ইত্যাদি স্থাপনা পরিবেশবান্ধব হিসাব গড়ে তোলা যায়।

সম্প্রতি রাজধানীর তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকান্ডে শতাধিক শ্রমিক আগুনে পুড়ে ছাই হওয়ার পর বাংলাদেশের গার্মেন্টস, বিশেষতঃ এখানকার শ্রমিকদের জীবন ও কাজের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা সমালোচনা অনেক বৃদ্ধি পায়।

এ ঘটনার পাঁচ মাসের মাথায় বিশ্বের ইতিহাসে গার্মেন্টস কারখানার সবচেয়ে ভয়ংকর বিপর্যয় যে বাংলাদেশেই ঘটবে, এটা কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। কেননা, সবারই ধারনা ছিল, তাজরীনের পর সরকার, বিজিএমইএ, মালিক, বায়ার ও ব্র্যান্ড সবারই সতর্কতা তৈরি করবে। সবার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে, সারা দেশকে কাঁদিয়ে সাভারের রানা প্লাজার ধস থেকে পাওয়া গেল এক হাজার ১২৭ শ্রমিকের লাশ, যাদের অধিকাংশই নারী। এখনো শত শত মানুষ নিখোঁজ আছে। আহত হয়েছে হাজারেরও বেশি সংখ্যক শ্রমিক।

মূলতঃ রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক কারখানার কর্ম পরিবেশ উন্নত করার জন্য দেশি-বিদেশী চাপ তৈরি হয়। পরিবেশ রক্ষার তাগিদ অবশ্য তারও অনেক আগে থেকেই। সে প্রেক্ষাপটে তৈরি পোশাক শিল্পের নতুন দিনের যাত্রা শুরু হয়েছে। কর্ম পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় জোর দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়ের খাতটির উদ্যোক্তা।

বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা পিছিয়ে নেই। নতুন নতুন পরিবেশবান্ধব পোশাক ও বস্ত্র কারখানা নির্মিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিকমানের এসব পোশাক ও বস্ত্র কারখানা অন্য কারখানার চেয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সাশ্রয়ী, কম কার্বন নিঃসরণকারী ও উৎপাদনশীলতা বেশি।

দেশের রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য শুধুমাত্র পোশাক কারখানা নয় অন্যান্য কারখানাও আন্তর্জাতিক মানসম্পন হওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেজ্ঞগণ।

একই ধরনের খবর

মন্তব্য করুন