ভাষা-আন্দোলন নিয়ে এম আবদুল আলীমের দশ বই

মাসব্যপী চলছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বিচিত্র বিষয়ে গ্রন্থ রচিত হয়েছে। নিত্যনতুন বই হাতে পেয়ে পাঠকের প্রাণ আনন্দে নাচছে। ভাষা-আন্দোলন বিষয়ক বইয়ের কমতি থাকলেও পাঠককে আশান্বিত করে এগিয়ে এসেছেন ইতিহাস-ঐতিহ্য সন্ধানী গবেষক এম আবদুল আলীম। এ পর্যন্ত ভাষা-আন্দোলন নিয়ে তাঁর দশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

পৈত্রিক ভিটা পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গৌরীগ্রামে ‘ভাষা-আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করে ভাষা-আন্দোলনের অনালোকিত নানা বিষয়ে গবেষণা করে তিনি সৃষ্টি করেছেন নতুন মাইল ফলক।

ভাষা-আন্দোলন নিয়ে এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো : ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা-আন্দোলন’ (বাংলা একাডেমি, ২০২০), ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’ (কথাপ্রকাশ, ২০২০), ‘আওয়ামী লীগ ও ভাষা-আন্দোলন’ (আগামী প্রকাশনী, ২০২০), ‘ভাষাসংগ্রামী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’ (আগামী প্রকাশনী, ২০২০), ‘ভাষাসংগ্রামী এম এ ওয়াদুদ’ (কথাপ্রকাশ, ২০২০), ‘ভাষাসংগ্রামী তাজউদ্দীন আহমদ’ (কথাপ্রকাশ, ২০২০), ‘সিরাজগঞ্জে ভাষা আন্দোলন’ (আগামী প্রকাশনী, ২০১৯), ‘ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিব : কতিপয় দলিল’ (আগামী প্রকাশনী, ২০১৯), ‘ভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগ : কতিপয় দলিল’ (আগামী প্রকাশনী, ২০১৯), ‘পাবনায় ভাষা আন্দোলন’ (রোদেলা প্রকাশনী, ২০১৩)।

ভাষা-আন্দোলনের দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এ নিয়ে কোনো কোষগ্রন্থ ছিল না। এ কাজ করে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছেন শেকড়সন্ধানী গবেষক এম আবদুল আলীম। ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’ প্রথম খন্ড। গ্রন্থটি তিন খন্ডে পরিকল্পিত।

ভাষা-আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, তৎকালীন দেশ-কাল-পরিবেশ; রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল; ভাষা-আন্দোলনের ঘটনাবলি, ভাষাশহিদদের প্রসঙ্গ ও পক্ষ-বিপক্ষের কুশীলবগণের ভূমিকা; ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতি-বিজড়িত স্থান, এ সম্পর্কিত গ্রন্থরাজি, পত্র-পত্রিকা ও স্মারক; একুশের চেতনা ও তৎ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সাম্প্রতিক প্রবণতা এক কথায় ভাষা-আন্দোলন ও একুশের চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিচিত্র বিষয় এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

বৃহৎকলেবর ও বিপুল তথ্যসম্ভারে পরিপূর্ণ গ্রন্থটির মুখবন্ধে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেনঃ ‘এতে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের পক্ষে-বিপক্ষের ব্যক্তির পরিচয় যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি এই আন্দোলন-সংক্রান্ত খুঁটিনাটি ঘটনারও উল্লেখ আছে। এমন একটি কোষগ্রন্থের প্রয়োজন যে ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। আবদুল আলীম এককভাবে কাজটি করে আমাদের অভিনন্দনভাজন হয়েছেন।’

ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক এটিকে ধ্রুপদী চরিত্রের গ্রন্থ বলে অভিহিত করেছেন। গবষক শামসুজ্জামান খান এ গ্রন্থের মলাট-পরিচিতিতে লিখেছেনঃ ‘‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’ গবেষণাগ্রন্থটি এ ক্ষেত্রে এক বিশেষ মাইলফলক। বিষয়ের বিস্তৃতি, দুষ্প্রাপ্য তথ্যের সংযোজন, পূর্ববর্তী এতদ্সংক্রান্ত ইতিহাসের অপূর্ণতা পূরণ এবং অনুপুক্সক্ষ সন্ধান-প্রবণতায় তার এ কাজটি সত্যিকার অর্থেই দৃষ্টি উন্মোচনকারী।’’ বাস্তবিকই বিষয়বৈচিত্র্য, তথ্যপ্রাচুর্য এবং দুষ্প্রাপ্য তথ্যসন্নিবেশে এটি ভাষা-আন্দোলন গবেষণায় এক নতুন মাইল ফলক ও নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচন করেছে।

ভাষা-আন্দোলন গবেষণায় এম আবদুল আলীমের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা-আন্দোলন’। মুজিববর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমির ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মশতবর্ষ গ্রন্থমালা’য় গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে।

ভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে এতদিন যে ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছিল, এ গ্রন্থে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত দ্বারা তা দূর করা হয়েছে।

জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম গ্রন্থটি সম্পর্কে বলেছেন, ‘বর্তমান প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের সঠিক তথ্য ও ইতিহাস তুলে ধরতে এম আবদুল আলীম রচিত বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।’

এম আবদুল আলীমের ভাষাসংগ্রামী গ্রন্থমালার গ্রন্থগুলো নতুন প্রজন্মকে ভাষাসংগ্রামীদের গৌরবগাথা তুলে ধরতে সক্ষম হবে। এ গ্রন্থমেলায় তাঁর প্রকাশিত অপর একটি গ্রন্থ হলো, ভাষাসংগ্রামী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ লেখনীর মাধ্যমে যেমন তেমনি সভাসমাবেশ ও মিছিলে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি আদায়ে ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর ভাষা-আন্দোলনে অবদান নিয়ে প্রথম গ্রন্থ রচনা করেছেন এম আবদুল আলীম।

এছাড়া তাজউদ্দীন আহমদ এবং এম এ ওয়াদুদের ভাষা-আন্দোলনে ভূমিকা নিয়ে তিনি রচনা করেছেন স্বতন্ত্র দুটি গ্রন্থ, ‘ভাষাসংগ্রামী এম এ ওয়াদুদ’ ও ‘ভাষাসংগ্রামী তাজউদ্দীন আহমদ’।

ভাষা-আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস রচনায় এম আবদুল আলীম বিশেষ অবদান রেখেছেন। ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে প্রধানত ঢাকার ভাষা-আন্দোলনের ঘটনা প্রাধান্য পেলেও এম আবদুল আলীম এর পাশাপাশি গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকার বাইরের ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস-অনুসন্ধানে। তিনি হাত দিয়েছেন ‘ভাষা-আন্দোলনের স্থানীয় ইতিহাস’ নামে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনায়।

এছাড়া ‘পাবনায় ভাষা-আন্দোলন’ ও ‘সিরাজগঞ্জে ভাষা-আন্দোলন’ নামে তাঁর আলাদা দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘পাবনায় ভাষা-আন্দোলন’ গবেষণাগ্রন্থের জন্য তিনি লাভ করেছেন ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’ (২০১৪)।

ভাষা-আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের রয়েছে অনন্য অবদান। গণ আজাদী লীগ, তমদ্দুন মজলিস, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ফেডারেশন, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রভৃতি সংগঠনের প্রত্যক্ষ অবদানে ভাষা-আন্দোলন সফলতা লাভ করে।

এম আবদুল আলীম এসব সংগঠনের যথাযথ অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে গবেষণা করছেন। এ বিষয়ে এ পর্যন্ত প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থগুলো হলো : ‘ভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগঃ কতিপয় দলিল’, ‘আওয়ামী লীগ ও ভাষা আন্দোলন’ প্রভৃতি। এসব গ্রন্থে ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসের অজানা নানা বিষয় উঠে এসেছে।

বস্তুত, ভাষা-আন্দোলন গবেষণায় যখন নিষ্প্রভতা লক্ষ করা যাচ্ছিল, তখন প্রতিশ্রতিশীল গবেষক এম আবদুল আলীমের এসব উদ্যোগ পাঠক ও গবেষকদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

একই ধরনের খবর

মন্তব্য করুন