মুজিব বাহিনী: পর্ব – ৪

বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান
বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান

ওসমানীর সংশয় একেবারে অমূলক ছিলো না। কাছাকাছি হওয়ায় প্রচারণায় সবচেয়ে বেশী লাইনেজ পেতো মেজর জলিলের নয় নম্বর সেক্টর। এ নিয়ে জিয়াউর রহমান সহ অন্য সেক্টর কমান্ডাররা অসন্তুষ্ট ছিলেন। নজরুল লিখেছেন : সেদিনের মেজর জিয়াউর রহমান একজন সেক্টর কমান্ডার, একবার কলকাতায় এসে আমাকে বলেছিলেন আপনি তো শুধু মেজর জলিল সাহেবের সেক্টর নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। আমাদের দিকেও একটু খেয়াল-টেয়াল রাখবেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষার্ধে জিয়াকে যখন এক নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব ছেড়ে একটি ব্রিগেড গঠন করার নির্দেশ দেওয়া হয়, জিয়া তা পালন করলেন ঠিকই কিন্তু তার দলের নাম রাখলেন ‘জিয়া বাহিনী’। এমনিতে ওসমানী ‘মুজিব বাহিনী’ নিয়ে ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিলেন, জিয়ার এই পদক্ষেপ আগুনে ঘি ঢাললো। ওসমানী জিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক কমান্ডকে অস্বীকার করার অভিযোগ এনে তার নেতৃত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেন। সিদান্তটি সত্যি কার্যকর করা হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা কি হতো ভাবতেই শিউরে উঠি, তবে তা হয়নি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের বিচক্ষণতার কারণে। তিনি ওসমানীর সিদ্ধান্তটি বাতিল করে আরো দুটি বাহিনী গঠন করার পাল্টা নির্দেশ দিলেন। ‘খালেদ বাহিনী’ ও ‘শফিউল্লাহ বাহিনী’র জন্ম এভাবেই। আমরা যাদের জেড ফোর্স, কে ফোর্স ও এস ফোর্স হিসেবে চিনি।

আসা যাক তাজউদ্দিনের প্রতিক্রিয়ায়। তিনি বিরক্ত হলেও নিরূপায় ছিলেন। তবে উবান লিখেছেন অন্যভাবে : অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার মানেই অপরিহার্যভাবে মি. তাজউদ্দিন। তিনি মুজিব বাহিনী নেতাদের দু চোখে দেখতে পারতেন না। এবং তাদের প্রতিটি অভিযোগকে বাজে কথা বলে উড়িয়ে দিতেন। ‘মুজিব বাহিনী’ নামে একটি সংগঠন মাঠে নেমেছে এটা প্রথম জানাজানি হয় আগস্টের শুরুতে যখন বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে মুজিব বাহিনীর পরিচয়গত সংঘাত সৃষ্টি হয়। ২ নম্বর সেক্টরে খালেদ মোশাররফের বাহিনীর চ্যালেঞ্জে পড়েন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পোষাক পড়া অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ ৪০ জন মুজিব বাহিনী সদস্য। পরে উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে এটির সমাধান হয়। এছাড়া নয় নম্বর সেক্টরেও ঘটে এমন ঘটনা। মেজর জলিল এক সাক্ষাতকারে বলেছেন : ‘আমার সেক্টরে হিঙ্গেলগঞ্জ ফিল্ডে যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তারা ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেন। তারা তখন ভেতরে অনুপ্রবেশ করছিল। সেখানে তাদের চ্যালেঞ্জ করা হয়। এক ভদ্রলোক নিজেকে ক্যাপ্টেন জিকু (জাসদ নেতা নুরে আলম জিকু) বলে পরিচয় দেন। তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।’

এই অবস্থায় মুজিব নগর সরকারের সঙ্গে কলকাতার হিন্দুস্তান ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন মুজিব বাহিনীর নেতারা। ভারত সরকারের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ প্রতিনিধি ডিপি ধর এতে অংশ নেন আর মুজিব নগর সরকারের তরফে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন। সেপ্টেম্বর মাসে আরেকটি বৈঠক হলেও প্রথমবারই একটি আপোষরফায় আসে দুপক্ষ। বৈঠকে শাহজাহান সিরাজকে দেওয়া হয় মুজিব বাহিনী ও তাজউদ্দিন সরকারের মধ্যে লিঁয়াজো রাখার দায়িত্ব। এ বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয় সীমান্ত থেকে ২০ মাইল পর্যন্ত মুক্তি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করবে, তারপর থেকে ভেতরের দিকের দায়িত্ব নেবে মুজিব বাহিনী। তাদের অপারেশন সম্পর্কে তারা কাউকে জানাতে বাধ্য থাকবে না, তবে শুধুমাত্র স্থানীয় সেনা ইউনিট কমান্ডারই জানবেন তাদের অনুপ্রবেশে কথা, তার অনুমতিই নিয়েই তারা ভেতরে প্রবেশ করবেন। ওসমানী, তাজউদ্দিন কিংবা অরোরা কারোই এই বাহিনীর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো তাদেরকে জানানো হবে।

মুজিব বাহিনীর যুদ্ধ : উদ্দেশ্য বামপন্থী নির্মূল!

এখানে উল্লেখ না করলেই নয় মুক্তিবাহিনীর রিক্রুটের জায়গাগুলোতে (যুব শিবির) আওয়ামী লীগের নেতারা স্ক্রিনিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তাদের কাজ ছিল মুক্তিবাহিনীতে যেন আওয়ামী ঘরানার বাইরে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রবেশ না ঘটে। কিন্তু তারপরও তা ঠেকানো যায়নি।

উবান লিখেছেন: Young men had been coming in their thousands at this time to have training, but there was no satisfactory procedure to find out the sincerity and motive of all those who were coming for the purpose of training. For this the training camps had to depend on the certificates given by the National Assembly members (MNA) appointed by the provisional government about the sincerity of the trainees. MNAs used to issue the certificates, blindly based on the list prepared by the Bengali officers, but some of these trainees had a future political motive. As a result, a few groups vanished with their weapons into the deep interior of Bangladesh, while some others would return after hiding their weapons and report that the weapons had been captured and gone out from their hands. To put an end to these unhappy activities, a fullproof solution was put forward, but the senior officials did not accept it, because, being in higher positions, they considered their knowledge to be superior too.’

উবান জুলাইয়ের দিকে ব্যক্তিগতভাবে এনিয়ে উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ করেছিলেন। তার অভিযোগ ছিলো জিয়া এবং খালেদ মোশাররফসহ বেশ কজন সামরিক অফিসারের বিরুদ্ধে তার অভিযোগে উল্লেখ করেন যে মুক্তিবাহিনীতে এদের প্রশ্রয়ে কিছু নকশালপন্থী এবং চীন পন্থী পাকিস্তানি এজেন্টের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তার সেই অভিযোগে (ইমেজ ফাইল দেখুন) রাশেদ খান মেনন ও তার ভাইদের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি জিয়া-খালেদরা ব্যক্তিগত বাহিনী তৈরি করছেন যার মাধ্যমে স্বাধীনতার পর ক্ষমতা দখল করার মতলব আঁটছেন। সে সময় কমরেড ফরহাদের নেতৃত্বে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা আলাদা ভাবে ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। নিচ্ছিলেন চীনা পন্থী ন্যাপ ভাসানীর সদস্যরাও। এ সময় বারবার সর্বদলীয় একটি বিপ্লবী সরকার গঠনের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল তাজউদ্দিনকে। এ ব্যাপারে অবশ্য ইন্দিরারই অমত ছিল। কারণ বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ কেসটি ছিল নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা না দিয়ে উল্টো হত্যা নির্যাতনের মাধ্যমে দেশছাড়া করার। মুজিব নগর সরকার ছিলো তার আদর্শ প্রতিরূপ। সেখানে সর্বদলীয় বিপ্লবী সরকার মানে পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ কিংবা ভারতের উস্কানিতে বিচ্ছিন্নতাবাদের অপচেষ্টা জাতীয় থিওরিগুলোকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া।

মুজিব বাহিনীর নেতারাও এনিয়ে বারবার অভিযোগ করেছেন যে ভারত সরকার নকশালপন্থী-চীনপন্থীদেরও ট্রেনিং দিচ্ছে এবং এ ব্যাপারে তাদের অপছন্দের কথাও তারা উবানকে জানিয়েছেন। উবান এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন তার লেখায়:

These four leaders inform us that many undesirable persons similar to the Naxalites are making inroads (into the Mukti Bahini) in Bangladesh and are getting training and weapons. They warn that these weapons will not be used against the Pakistanis; rather, they are being hidden in Bangladesh so that they can be used after independence in support of movements similar to the Naxalite one. In fact, they mention the names of the pro-Chinese communist leaders who are connected to some army officials of Bangladesh and through whose approval a large number of communist cadres were being recruited and trained and armed with weapons. The matter was brought to the notice of the authorities confidentially, but the result was nil.

The young leaders have seen Bangladesh’s Naxalite men gossiping with the Indian officials in an aristocratic hotel of India. Perhaps the Naxalites lived in such hotels. The young leaders knew that during military rule in East Pakistan those people had been their worst enemies. It was originally against them that the youth organisation of the Awami League was established. The young leaders failed to understand why India was partial towards their identified enemy.

So they mistakenly concluded that the goal of our government was to enable a communist party to stand on solid ground in Bangladesh. They also came to know through a reliable source that the Marxist workers and Moulana Bhasani’s followers were getting separate training and weapons.

এ বিষয়ে উবান তুলে ধরেছেন এ বিষয়ে এক কথোপকথনে আরএন কাও’র মন্তব্য :

Moulana Bhasani’s Naxalites are getting their training in a different venue. They had not been put in my custody, because he was certain I would not keep any such promise and the young leaders would very soon find out where those trainees were. This would cause a very serious disturbance. কাও বরং এর দায় চাপিয়েছেন তাজউদ্দিন সরকারের উপরই : We have done nothing against the wishes of the provisional government of Bangladesh and they think Bhasani’s men are a very valuable resource against the Pakistanis. How can we disregard their advice? Tell your young leaders that even if they do not like it they have to swallow it. In the overall planning we will support them only as a key branch, but not as an entity possessing an independent political leadership. We cannot do anything if they do not walk on the right path. Let them go to the dogs.
(চলবে…)

লেখা: বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মতিউর রহমান, কলামিস্ট, ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি।

সহায়তা/উৎস:অমি রহমান পিয়াল, লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, ব্লগার, বর্তমানে প্রবাসী।

আরও পড়ুনঃ মুজিব বাহিনীঃ পর্ব-৩

একই ধরনের খবর

মন্তব্য করুন