সিলেট সিটি করপোরেশনে অভিযোগ উঠলো পুকুর সংস্কার কাজে বড় রকমের অনিয়মের

মিজানুর রহমান, সিলেটঃ অপরিকল্পিত ও নিম্নমানের কাজের জন্য সরকারি বরদ্দের টাকা সঠিকভাবে কাজে আসছে না নগরবাসীর কাছ থেকে এমন অভিযোগ ওঠেছে বিভিন্ন সময়। এবার অভিযোগ উঠলো পুকুর সংস্কার কাজে বড় রকমের অনিয়মের।

প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত আরসিসি গার্ডওয়াল ও পুকুর পাড়ের রাস্তা সংস্কার কাজের দুই বছরের মাথায় ফের খনন করতে গিয়ে ভেঙ্গে পড়েছে। স্থানীদের অভিযোগ অপরকল্পিত খনন ও নিম্নমানের কাজের জন্য এমন ঘটনা ঘটেছে । উন্নয়নের নামে লুটপাটের উদাহরণ হিসেবে তারা তুলে ধরছেন নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের রায়নগর সোনারপাড়ার এই পুকুর সংস্কার কাজকে। তারা এটাকে সিটি করপোরেশনের ‘পুকুর চুরি’ হিসেবেই আখ্যা দিচ্ছেন।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে রায়নগর সোনারপাড়া জামে মসজিদ পুকুরের গার্ডওয়াল এসএস রেলিং ও মাটি ভরাটের কাজ করা হয়। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও তৎকালীন কাউন্সিলর দিনার খান হাসু এ কাজের উদ্বোধন করেন। দু’বছর পর একই পুকুর সংস্কার কাজের উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। গত বুধবার রাতে এক্সিভেটর লাগিয়ে ঠিকাদার মিজান আজিজ সুইট পুকুর থেকে মাটি উত্তোলন শুরু করেন।

কিছু মাটি তোলার পরই পুকুরের পূর্ব ও উত্তর পাশের আরসিসি গার্ডওয়ালসহ রাস্তা ধ্বসে পড়ে। একই সাথে দক্ষিণ পাশের ‘রুহাদ ভিউ’ নামক বহুতল ভবনের ওয়ালের পাশ ঘেষে ফাটল দেখা দেয়। পুকুরের দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের রাস্তায়ও আড়াআড়িভাবে ফাটল দেখা দেয়।

গত শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুকুরের পাড় ধ্বসে ‘রুয়াদ ভিউ’ ও দক্ষিণ পাশের রাস্তার ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কায় কয়েকজন শ্রমিক মিলে ফের পুকুরের মাটি ফেলছেন। সরেজমিনে আরও দেখা যায়, পূর্ব ও উত্তর পাশের আরসিসি ওয়ালের ভাঙ্গা স্থানে কোন রডের ব্যবহার নেই। যদিও সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা বলছেন, আরসিসি দেয়ালের সংযোগস্থল (জয়েন্টে) ভাঙ্গায় রড দেখা যাচ্ছে না।

দেয়ালে স্থায়িত্ব ও শক্তি বাড়ানোর জন্য জয়েন্টে রডের ব্যবহার হয়নি- প্রকৌশলীরা এমন দাবি করলেও তাদের এই যুক্তি টিকিয়ে রাখতে পারেনি দুইবছর আগে করা আরসিসি দেয়াল। জয়েন্টের উভয়পাশের দেয়ালই ধ্বসে পড়েছে। এছাড়া পুকুরের উত্তর পাশের রাস্তার মাঝামাঝি ফাটল দিয়ে ধ্বসে পড়েছে। ওই রাস্তায়ও কোন রডের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাস্তাটির কোথাও পাঁচ ইঞ্চি আবার কোথাও তিন ইঞ্চি ঢালাই ছিল।

সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালে পুকুর সংস্কারের কাজটি পেয়েছিল পিনু এন্ড কানু নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরে তৎকালীন কাউন্সিলর দিনার খান হাসু ঠিকাদারের কাছ থেকে কিনে নিয়ে নিজে কাজটি করান। কাউন্সিলর নিজেই ঠিকাদার হওয়ায় তিনি তার ইচ্ছেমতো কাজ করেন। সিটি করপোরেশনের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের ম্যানেজ করেই তিনি দায়সারাভাবে কাজটি সারেন। নিজ দলের নেতা হওয়ায় এই কাজের ব্যাপারে নিরব ছিলেন সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীও। সাবেক কাউন্সিলর দিনার খান হাসু দেশে্র বাহিরে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, আরসিসি দেয়াল ও রাস্তা ধ্বসে পড়ার জন্য সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা দায়ী করছেন পুকুর থেকে মাটি উত্তোলনকারী মিজান আজিজ সুইটকে। তাদের অভিযোগ, পুকুর থেকে বেশি পরিমাণে মাটি উত্তোলন করায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিজান আজিজ সুইট ওই পুকুর সংস্কারের কাজের দায়ীত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার নয়। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্টজন হিসেবেই তিনি ওই কাজ করছিলেন।

এ ব্যাপারে মিজান আজিজ সুইটের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, ‘ঠিকাদার মিজান আজিজ সুইট অতিরিক্ত মাটি উত্তোলন করায় দেয়াল ভেঙ্গে পড়েছে। এছাড়া নির্মাণ কাজে সঠিকভাবে রডের ব্যবহার হয়েছিল কি-না তা খতিয়ে দেখতে দেয়াল ভেঙ্গে তদন্ত করা হবে।’

এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করার কথা জানিয়েছেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘নির্মাণ কাজের অনিয়ম হোক আর অতিরিক্ত মাটি উত্তোলনের জন্য হোক, দায়িদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

একই ধরনের খবর

মন্তব্য করুন